নিশিদিন তোমায় ভালোবাসি
সুমিতা বসুর কলমে ….
‘চিরনূতনেরে দিল ডাক
পঁচিশে বৈশাখ। ‘
প্রিয় কবি, ১৮৯৯ সালে তোমার ৩৮ তম জন্মদিনে তুমি যখন প্রথম নিজের জন্মদিন উপলক্ষে লিখেছিলে,
দীনতা হতে অক্ষয় ধনে, সংশয় হতে সত্যসদনে,
'ভয় হতে তব অভয়মাঝে নূতন জনম দাও হে
জড়তা হতে নবীন জীবনে নূতন জনম দাও হে’….এর মধ্যে উপনিষদের গভীরতম বাণীই ছিল প্রত্যক্ষ,
‘অসতো মা সদ্গময়/ তমসো মা জ্যোতির্গময়/ মৃত্যোর্মামৃতং গময়’।
‘অসত্য হইতে আমাকে সত্যে লইয়া যাও, অন্ধকার হইতে আমাকে জ্যোতিতে লইয়া যাও, মৃত্যু হইতে আমাকে অমৃতে লইয়া যাও। হে স্বপ্রকাশ, আমার নিকটে প্রকাশিত হও। রুদ্র, তোমার যে প্রসন্ন মুখ, তাহার দ্বারা আমাকে সর্বদাই রক্ষা করো’।
তারপর তোমার শেষ গানও এই জন্মদিন উপলক্ষেই লেখা,’ হে নুতন দেখা দিক আরবার’— কবিতা হিসেবে ১৯২২ লেখা হলেও, সুরারোপ করা হয়েছিল ৬ই মে, ১৯৪১। শান্তিদেব ঘোষের স্মৃতিচারণায়, ‘ পঁচিশে বৈশাখ কবিতাটির, হে নুতন দেখা দিক আরবার অংশটি একটু অদল বদল করে সুর সংযোজনা করলেন।
সেদিন ২৩ শে বৈশাখ। পরের দিন সকালে পুনরায় গানটি আমার গলায় শুনে বললেন, হাঁ, এবার হয়েছে। সেদিন ঘুণাক্ষরেও মনে হয়নি, এই তাঁর জীবনের সর্বশেষ গান ‘… (রবীন্দ্রসংগীত / শান্তিদেব ঘোষ)
শেষ গান? শেষ কথাটা একেবারে বুকে এসে বিঁধল। তোমার আড়াই হাজার গানে কালানুক্রমিক প্রথম ও শেষের নির্দেশ থাকলেও, গান ও গানে তোমার কোথাও নেই শেষ . তোমার কথাই ধার করে বলি, ….’ফিরে শুনি যখন, বিস্মিত হই এবং নিজেকে বলি – তোমার গান রইল, এ আর কাল অপহরণ করতে পারবে না। ‘ (২৬ শে মে, ১৯৪১)
আক্ষরিক অর্থে হলেও, তোমার গানে শুরু আর শেষ যেখানে বৃত্তে মিলে যায়– সেখানে আরম্ভে আর শেষে আর তার সঙ্গে চিরন্তনতায় কোনো পার্থক্য নেই।
তোমার ‘ শেষ লেখায়’ তুমি নিজেই তো বলেছো,
প্রথম দিনের সূর্য
প্রশ্ন করেছিল
সত্তার নূতন আবির্ভাবে–
কে তুমি,
মেলে নি উত্তর।…
দিবসের শেষ সূর্য
শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল পশ্চিম-সাগরতীরে…
কে তুমি
পেল না উত্তর।
উত্তর পাওয়া যায় না– তোমার প্রকাশ দিনে রাতে, সব ঋতুতে, সব মুহূর্তে। তাই, শুধু আজ নয়, শুধু পঁচিশে বৈশাখ নয়, তুমি আছ অন্তরে, প্রতিনিয়ত, নিশিদিন।
আছো, গ্রীষ্মের বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের ‘দারুন অগ্নি বাণে’, আষাঢ়ের ‘প্রথম দিবসে’, শ্রাবণের ধারায়, আশ্বিনের শরতের সাদা মেঘে সারা আকাশ জুড়ে তুমি এসেছো অতিথির বেশে, মন বলে ‘শরতে আজ কোন্ অতিথি এল প্রাণের দ্বারে/ আনন্দগান গা রে হৃদয়, আনন্দগান গা’, চমকে উঠে শুনতে পাই তোমার গলার স্বর, ‘কেমনে চলিবে পথ চিনে? আজি এই আকুল আশ্বিনে. মেঘে-ঢাকা দুরন্ত দুর্দিনে. হেমন্ত-ধানের খেতে বাতাস উঠেছে মেতে… কেমনে চলিবে পথ চিনে?’ কার্তিকের হাওয়ায় অজানা কান্না, শীতের শিরশিরে হাওয়া আর মনে পড়ে কাহিনীর সেই মর্মান্তিক ঘটনা, দেবতার গ্রাস, যেখানে, ‘হেমন্তের প্রভাতশিশিরে. ছলছল করে গ্রাম চূর্ণীনদীতীরে’….আসে বসন্ত আনে নতুন প্রাণের বার্তা তার ফুলে ফুলে বর্ণে গন্ধে, তবু তুমি আনমনা কেন যে বল, ‘উৎসবরাজ দেখেন চেয়ে ঝরা ফুলের খেলা রে ‘!! গানটা কানে বাজতে থাকে,
‘বসন্তে কি শুধু কেবল ফোটা ফুলের মেলা রে/ দেখিস নে কি শুকনো পাতা ঝরা ফুলের খেলা রে’
সত্যি সুখের দিনে জীবনের বসন্তে আমরা ক্রন্দন ভরা বসন্তকে দেখতে পাই না মোটেই, কিন্তু তুমি পেরেছো। তবু বসন্তে আছে প্রাণ আছে আনন্দ, ‘ফাল্গুনী’র বাউল যেমন বলে, ‘ যারা ম’রে অমর, বসন্তের কচি পাতায় তারাই পত্র পাঠিয়েছে। ….আমরা পাথেয়র হিসাব রাখি নি–আমরা ছুটে এসেছি, আমরা ফুটে বেরিয়েছি। আমরা যদি ভাবতে বসতুম তা হলে বসন্তের দশা কী হত।’
তাই তো তুমি গান বেঁধেছ, ‘বসন্তে ফুল গাঁথল আমার জয়ের মালা/ বইল প্রাণে দখিন হাওয়া আগুন-জ্বালা ‘
তারপর, আবার ফিরে আসে বৈশাখ, গৌতম বুদ্ধের বৈশাখ– বুদ্ধপূর্ণিমা, তোমার বৈশাখ, আর আমাদের সকলের পঁচিশে বৈশাখ আমাদের, ‘রবি পূর্ণিমা’, তিথির অতীত!
আমরা গর্বিত বাঙালি বলে, গর্বিত বাংলা ভাষায় তোমায় পড়তে পারি, বুঝতে চেষ্টা করি, উপলদ্ধি করার আকাঙ্খায় ….
আজ তোমার ভুবন জোড়া আসনখানি পাতা পথের ধারে আবার তেমনি বিশ্ব গগন জুড়ে ….
‘হে নূতন/ দেখা দিক আর-বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ ….’
আমি, আমরা, আমরা সকলে, সকল বিশ্ববাসী….
…. নিশিদিন তোমায় ভালোবাসি..’
আমাদের কাছে তুমি নিত্য, সত্য, অমর্ত্য। আমাদের কাছে তাই পঁচিশে বৈশাখ ক্যালেন্ডারের একটি মাত্র দিন নয়, সেটি এক পূর্ণতার প্রতীক …প্রতিদিন প্রাতে প্রথম ঊষায় পঁচিশে বৈশাখ এসে হাতছানি দিয়ে যায়, ভালোবাসি তোমায়, তোমার গানকে, তোমার সৃষ্টিকে… নিশিদিন।