রাবড়ির নেশায় শিবরাম
সুমিতা বসুর কলমে ……
“নেশা করতে হলে রাবড়ির নেশা করাই তো ভালো “, বলেছিলেন শিবরাম চক্রবর্তী।
পুরো জীবনটাই যাঁর কাছে ছিল এক মস্ত ঠাট্টা, বাংলা সাহিত্যে তাঁর নাম শিবরাম চক্রবর্তী। উত্তরবঙ্গের চাঁচোল রাজপরিবারের ছেলে হয়েও কপর্দকহীন অবস্থায় সারাজীবনটাই কাটিয়েছেন। প্রাথমিক স্কুলে প্রশ্ন ছিল ‘বড় হয়ে কী হতে চাও?’ উত্তর সরাসরি আর সহজ – ‘দেশপ্রেমিক হতে চাই।’ মাস্টারমশায়ের তো চোখ ছানাবড়া! পরে বিপ্লবী দলে নামও লিখিয়েছিলেন, পকেটে বন্দুক নিয়ে দুরুদুরু বুকে ঘুরে বেড়িয়েছেন কিন্তু ব্যবহার করা হয়নি। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের ভাষণ শুনে অনুপ্রাণিত হয়ে এককথায় কলকাতায় হাজিরা। নানান্ বিপর্যয়, ঘটনার মধ্যে দিয়ে শেষপর্যন্ত কলকাতার মেসের স্থায়ী বাসিন্দা – ‘মুক্তারামের তক্তারামে’, শুরু ভবঘুরে জীবনের।
চক্কোত্তিমশাইকে নিয়ে অনেক গল্প, অতি পরিচিত একটি হলো, মানুষটিই সারাজীবন ধরে অভাব-অনটনের ঘানি বয়ে বেড়িয়েছেন। একবার এক চোর তার ঘরে চুরি করতে এসে উল্টো দশ টাকা, ধুপকাটির একটা প্যাকেট আর একখানা চিঠি রেখে গিয়েছিল। চিঠিতে লিখেছিল, ‘ভাই, তোমার ঘরে চুরি করতে এসে দেখলাম তোমার অবস্থা আমার থেকেও খারাপ। কাজকম্ম বোধহয় কিছুই করো না। এই দশটা টাকা রেখে গেলাম। এই টাকায় এই কোম্পানির ধূপকাঠি কিনে ফেরি কোরো। এইভাবে কত দিন চলবে? আমার পরামর্শ মানলে জীবনে উন্নতি করবে।’
সে বুদ্ধি যদিও কাজে লাগাননি তিনি, লিখেছেন বহু বিশেষতঃ , শিশু-কিশোরদের জন্য লিখেছেন দু-হাত ভরে। নিজেই বলতেন, “আমার ছোটদের লেখায় থাকে কিছু পোলা আর পান। পোলাপানদের জন্য লেখা এই আমার শিশুসাহিত্য।”
আজীবন বিশ্বাস করেছেন সকলকে, ঠকেওছেন বারবার। কারো প্রতি কখনো কোন অভিযোগ, অনুযোগ বা অভিমান ছিল না, নেশা বলতে একটাই, সেটা হলো খাওয়া। নিজেই বলতেন, ‘নেশা করলে রাবড়ির নেশা করাই ভাল’ ।
বড় ভালবাসতেন খেতে, বিশেষতঃ চপ, কাটলেট, রাবড়ি, মিষ্টি। কখনো পয়সা দিয়ে, কখনো ধারে- প্রিয় খাবার ঠিকই জুটে যেত মাঝে মধ্যে। অনেক মজার মজার অদ্ভুত সব গল্প আছে তাঁকে নিয়ে, আবার অনেক অবিশ্বাস্য মজার কাহিনি তৈরি হয়েছে তাঁর জাদুময় কলমের খোঁচায়। প্রায় সব চরিত্রই তাঁর কথার প্যাঁচে প্যাঁচে জীবন্ত – হর্ষবর্ধন, গোবর্ধন চরিত্রগুলি পড়শি হয়ে উঁকি মারে বই-এর পাতা থেকে। তাঁর সম্বন্ধে বলা হয়েছে, ‘his best known short stories and novels are renowned for their unique use of pun, alliteration, play of words and ironic humour’.

সব বাঙালির মন ভালো করা লেখক ছিলেন তিনি, হেসে হাসিয়ে তাঁর অনেক কষ্টের জীবনও ছিল সদা আনন্দময়। শেষ জীবনে স্মৃতিভ্রংশ, কথা অসংলগ্ন অবস্থাতেও, ‘কেমন আছেন’ জিজ্ঞেস করলে, ক্ষীণ গলায় উত্তর ‘ফার্স্ট ক্লাস’। নিজেই লিখেছেন ‘প্রেরণার আদায়ে নয়, প্রাণের দায়ে আমার লেখা। গায়ের জোর নেই বলে রিকশা টানতে পারি না, তার বদলে কলম টানি। কলমের ওপর টান আমার অতোটুকুই।’
হাসির রাজা শিবরাম হাসতে হাসতেই শেষ বিদায় নিলেন কলকাতা থেকে, বাংলার সাহিত্য জগৎ থেকে আর রেখে গেলেন হাসির ফোয়ারা বাংলা সাহিত্যের পাতায় পাতায়। তাঁর জীবনাবসনে তা কখনোই ক্ষীণ হয়নি এতটুকুও। তাঁর লেখা থেকে রুপালি পর্দায় এনেছিলেন ঋত্বিক ঘটক– ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে।’ সত্যিই শিবরাম শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর বাড়ি থেকে সকলের চোখে ধুলো দিয়ে গেলেন পালিয়ে- হয়তো ওপারে কোনোখানে হর্ষবর্ধন আর গোবর্ধনের সঙ্গে মোলাকাৎ করতে, কিংবা মিলেছে খোঁজ মুক্তারামের থেকে ও অনেক বেশী মুক্ত আরামের!
শনিবার আর বুধবার-এর খেলায় হর্ষবর্ধন আর গোবর্ধন কি দিচ্ছে তাঁকে ৫০০ টাকা ধার? তায়ে আবার এখন ৫০০ টাকা বিকল? কে জানে?
প্রার্থনা করি, মানুষটি পরজন্মে তাঁর সৃষ্টি হর্ষবর্ধন আর গোবর্ধনদের নিয়ে সুখে থাকুন, ভালো থাকুন, খেয়ে যান হাঁড়ি হাঁড়ি রাবড়ি।